শীর্ষ সংবাদ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
Home / ত্রিপল / মালজোড়া গানের জন্যে

মালজোড়া গানের জন্যে

রিয়াজ উদ্দীন ইসকা:
বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি বেগবান ধারা হল বাউল গান।বাউল গানের নানা দিক রয়েছে। আবার স্থানভেদে এর নাম পরিচিতি এবং আঙিক ভিন্ন। আমি এখানে বৃহত্তর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘মালজোড়া’ গানের কথা বলতে চাই। তবে বাউল গানের তত্ব তালাশ নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনায় যাব না।
,
শুরুতে বলে নেওয়া ভাল যে বাউল গানের শিল্পীদের গান গাওয়া এবং মালজোড়া গান গাওয়া এক নয়। মালজোড়া গানে পক্ষ- প্রতিপক্ষ থাকে। মূলতঃ দুইজন বাউল যে কোন বিষয়ের পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকেন। ‘মাল’ মানে পাহলোয়ান/ বাহাদুর/ শক্তিধর। তারা গানে, প্রশ্নোত্তরে, গল্পকথায় যুক্তি বিস্তার করে হাজার হাজার দর্শকশ্রোতাকে মাতিয়ে রাখেন রাতভর। একটি আসর শেষে মালজোড়া গানের রেশ থাকে বহুদিন। হাড্ডাহাড্ডি এই প্রতিযোগিতায় বাউলদের দক্ষতা ও শেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়। তাদের চাহিদা ও ভক্তসংখ্যা বাড়ে। মালজোড়া গানের বিষয় বৈচিত্রের শেষ নেই। জনপ্রিয় বিষয় গুলোর মধ্যে রয়েছে- শরিয়ত- মারিফত, আদম- হাওয়া, রাধা-কৃষ্ণ, হাশর-কেয়ামত, কারবালা, নারী-পুরুষ ইত্যাদি। মালজোড়ার দ্বৈতযুদ্ধ শুরু করার আগে কোন বিষয়ে গানের লড়াই হবে তা শ্রোতাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। প্রতিটি আসরে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সভাপতি করা হয়। গানের বিষয় নির্ধারণ থেকে আসর পরিচালনার ভার থাকে সভাপতির। একটি মালজোড়া গানের গল্প শুনেছিলাম সম্ভবতঃ বালাগঞ্জ উপজেলায়) – দুইজন খ্যাতনামা বাউলের সেই আসর একরাতে নিষ্পত্তি হয়নি। সেখানে পর পর তিন রাত মালজোড়া গানের যুদ্ধ হয়েছিল। তাও বিজয়ী বাউলশিল্পী কে তা নির্ধারণ করা যায়নি। সেই আসরের সাক্ষীরা, শ্রোতারা কত ভাগ্যবান ছিলেন তা এখনও আমাকে রোমাঞ্চিত করে।
,
গান গাইলে শিল্পী হওয়া যায় কিন্ত বাউল হওয়া যায় না। বাউলগানের শিল্পী হলেই মালজোড়া গানের বাউল হওয়া যায় না। মালজোড়া শুধু গান নয়। গানের সাথে সাধনা। উপস্থাপন ও বাগ্মীতায় দক্ষতা না থাকলে, উপস্থিত বুদ্ধি না থাকলে সফল বাউলশিল্পী হওয়া যায় না। বাগ্মীতা মানে বকবক করা বাগাড়ম্বর নয়। দলিল জেনে কথাবার্তা বলতে হয়। আদমসৃষ্টি, দেহতত্ব, পরমাত্মা, ভক্তিবাদ, কোরআন, হাদিস, গীতা, বেদ, বাইবেল, জাহিরী ও বাতুনী তত্ব-সূত্রসহ প্রতিটি বিষয়ের উপরে বাউলের দখল থাকে। তাদের এই অধ্যয়ন, জানা, জ্ঞানের ভাণ্ডার আমাকে অবাক করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বল্প শিক্ষিত একজন বাউলকে কী পরিমান জ্ঞান আহরণ করতে হয় তার নিরিখ নেই। গুরুমুখী এই বিদ্যায় একজন বাউল স্বশিক্ষিত হন, সম্পূর্ণ হন। কিন্তু এরা নিজেকে পণ্ডিত বলে দাবী করেন না, নিজেকে জাহির করেন না। মরমীয়া ভাবজগতে পরম বন্ধুর তালাশে এবং উদ্দেশ্যে মগ্ন থাকেন তারা। মানুষের অন্তরজগতকে নাড়িয়ে দেন পরম সত্যের খোঁজে। তাই বাউলচিত্তে সংকীর্ণতা, ভেদবুদ্ধি, শঠতার স্থান নেই। সাধারণের মাঝে মিলেমিশে থেকে তারা অসাধারণ হয়ে ওঠেন। মানুষের ভালোবাসা প্রাপ্তি তাদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
,
মালজোড়া গান নিয়ে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। বছর পনের পূর্বে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার হেলিপ্যাড মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল মালজোড়ার আসর। সিলেটের প্রখ্যাত বাউল ক্বারী আমীর উদ্দীন এবং ঢাকার নামকরা বাউল আরিফ দেওয়ান মুখোমুখি হয়েছিলেন। মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাজারখানেক দর্শক উপজেলা পরিষদের দ্বিতল ভবনে, হাসপাতালের ছাদে উঠে গেছেন গান শোনার জন্যে। কোথাও দাঁড়ানোর স্থান না পেয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ হজরত শাহ মালুম (রহঃ) এর মাজারে চলে গিয়ে গান-বাজনা করে রাত পার করেছেন! বাউলভক্তদের যানবাহনের সংখ্যা ছিল অগণিত। কুশিয়ারা নদীতে নৌকা রাখার স্থান ছিল না। শুধু ক্বারী আমীর উদ্দীনকে দেখার জন্য ভারতের করিমগঞ্জ থেকে অনেক ভক্তের আগমণ ঘটেছিল। বাউল গান, মালজোড়া গানের প্রতি মানুষের টান দেখে আমি অভিভূত হয়ে যাই। বাড়ি ফিরে আমার ভাতিজা নূরেল ও ভাগিনা হৃদয়কে বলি- ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চেয়ে ক্বারী আমীর উদ্দীন হও।
,
লোকসংস্কৃতির এই জনপ্রিয় মালজোড়া গানের বর্তমান অবস্থা কি? গত কয়েক বছরের মধ্যে সিলেটের কোথাও মালজোড়া গানের আসর হয়েছে বলে শুনিনি। মালজোড়া গান প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। বাঙ্গালী সংস্কৃতির দুশমনরা কালো থাবা বসিয়েছে। প্রশাসনও বেছে নিয়েছে সহজতম উপায়। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশকে। শুধু মালজোড়া গান নয়- যাত্রা, নাটক, মেলা ইত্যাদিও স্থবির হয়ে আছে। খোলা প্রান্তরের বাউল গান এখন বন্দী হচ্ছে টিভি স্টুডিওর ভেতরে। সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া একটি জাতির সুস্থতার লক্ষণ নয়। আমাদের নিজস্ব সম্পদ, আমাদের সংস্কৃতিকে লালন না করলে সেই স্থান দখল করবে অপসংস্কৃতির অনাচার। আমরা হারাবো সহজ মানুষ সোনার মানুষ। শুভ বুদ্ধির জয় হোক।

আপনার মন্তব্য

Check Also

জয় বাংলাকে বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার কথা বলা ভাঁওতাবাজি এবং আত্মপ্রতারণা করা মাত্র

ফেঞ্চুগঞ্জ |১৬ ডিসেম্বর ২০১৬: স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী ছাড়া সমগ্র জাতি মহান বিজয় দিবস উদযাপন করছেন। …