শীর্ষ সংবাদ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
Home / আলোচিত -সমালোচিত / ১৪ ই ডিসেম্বর তাদেরই|সুলতানা কামালের কলাম।

১৪ ই ডিসেম্বর তাদেরই|সুলতানা কামালের কলাম।

সময়ের নিজস্ব চলার অমোঘ নিয়মে প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর আসে। আবার চলেও যায়। ডিসেম্বর বড় বেশি ব্যস্ততার মাস—নানা দিবস উদ্‌যাপন ও উৎসব পালনের মাস। এরই মধ্য দিয়ে আজ আবার ১৪ ডিসেম্বর আমাদের হৃদয়ের দুয়ারে এসে কড়া নেড়েছে। তীব্র বেদনায়, কঠিন কষ্টের গভীর ক্ষতে ধাক্কা লাগে আবার। যাঁদের হারানোর ব্যথা নতুন করে বেজে ওঠে বুকের তারে তারে, তাঁদের কথা যে সারা বছর স্মরণে আসে না তা তো নয়। কিন্তু আজ ১৪ ডিসেম্বর তারিখটিতে মনের সবচেয়ে আদরের জায়গাটিতেই তাঁদের বসানোর দিন। আজ যে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।

কী দ্রুতগতিতে পার হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের পর ৪৬টি বছর।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। কলকাতায় আমাদের আশ্রয়দাত্রী কেকার (সাংবাদিক জওয়াদুল করিমের স্ত্রী) এক আত্মীয়ের বাড়িতে ফোন বেজে ওঠে। ফোনের অপর প্রান্তে বরাভয়দায়িনী গৌরী আইয়ুব। আনন্দ-উদ্বেগ মেশানো গলায় বললেন, ‘রেডিও ধরো, তোমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছ।’ বিশ্বাস-অবিশ্বাসে মেশা বুক-কাঁপা অনুভূতিতে রেডিওর নব ঘোরাতেই আকাশবাণীর খবরের অংশ কানে এল। একের পর এক পরিচিত নামের উচ্চারণ। কী করেছেন এঁরা? দেশ স্বাধীন হওয়া উপলক্ষে কোথাও জড়ো হয়েছেন—শহীদ মিনারে? বাংলা একাডেমিতে? কিন্তু আমাদের মা সুফিয়া কামালের নাম শুনছি না কেন? তিনি কি যোগ দেননি এত সব প্রাতঃস্মরণীয়, দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে এই সমাবেশে? তিনি কি অসুস্থ? শেষ লাইনটি কানে এল অবশেষে, ‘আলবদর, আল-শামস নামে সন্ত্রাসী বাহিনী এঁদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে।’

বুকে হৃৎপিণ্ডের শব্দ যেন থেমে গেল। ঘরের ভেতর কেউ কারও মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। কথা যা শুনলাম, তা কি সত্যি? একের পর এক চেহারাগুলো ভেসে উঠতে লাগল। এ কেমন কথা? দেশ স্বাধীন হলো, অথচ এঁরাই নেই?

শহীদুল্লা কায়সার, মুনীর চৌধুরী, গিয়াসুদ্দীন আহমেদ, আলীম চৌধুরী, সিরাজুদ্দীন হোসেন, ফজলে রাব্বী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, আনোয়ার পাশা। আরও কত সব পরিচিত নাম। এঁদের সবারই মায়ের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা। কত কাজ, কত কর্মের সঙ্গী এঁরা আমার মায়ের। এঁদের অনেকেই আমাদের পরিবারের সদস্যসম।

শহীদুল্লা কায়সারকে ছোট বোন টুলু আর আমি ডাকতাম ‘ভাইয়া’ বলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অধ্যয়নকাল ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১। সে সময়টাতে শহীদুল্লা ভাইয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটে আমার। ঘটনাচক্রে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংস্কৃতি সংসদের দায়িত্বশীল পদ নিতে হলো। সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে দৈনিক সংবাদ-এর সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। শহীদুল্লা ভাই আর সংবাদ—সেই সময়ের নানা আন্দোলন—সবকিছু একের সঙ্গে অপর অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। উত্তাল গণজাগরণের সেই সময় কেউ কারও কাছ থেকে দূরে থাকতে পারি না। সভা-সমিতি-সেমিনার-মিটিং-মিছিল আমাদের জীবন আপ্লুত করে রেখেছিল। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার তাগিদ থামানোর কোনো জো ছিল না গণতন্ত্রকামী সচেতন মানুষের। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্রোত গিয়ে মিশেছে মূলধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে। এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় অভিনয় করেছিলাম ম্যাক্সিম গোর্কির মা নাটকে, নাতাশার ভূমিকায়। সেই থেকে শহীদুল্লা ভাইয়ের কাছে নাম পেয়েছিলাম ‘নাতাশা’। সংশপ্তক-এর স্রষ্টা শহীদুল্লা কায়সার, সারেং বউ-এর স্রষ্টা শহীদুল্লা কায়সার, ‘আমি মানুষের ভাই স্পার্টাকাস’ গানের রচয়িতা শহীদুল্লা কায়সার, আরও কত শত কথার জনক, কত মানুষের শিক্ষাগুরু শহীদুল্লা কায়সার—তাঁকে এত নির্মমভাবে হত্যা করল এই অমানুষেরা? তাঁর চিহ্নটুকুও কোথাও পাওয়া গেল না?

বিশালদেহী গম্ভীর গলার গিয়াসুদ্দীন আহমেদ, আমাদের স্যার? সাবসিডিয়ারির একটি বিষয় ইতিহাস থাকায় তাঁর সরাসরি ছাত্রী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। পাকিস্তানি আমলের আন্দোলনমুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে শিক্ষকদের পৃষ্ঠপোষকতা আর সমর্থন জরুরি ছিল। সংস্কৃতি সংসদের সব কাজে সহায়তা পেয়েছি গিয়াসুদ্দীন স্যারের। ব্যক্তিগতভাবে পেয়েছি অপার স্নেহ। আমাদের যেকোনো প্রয়োজনে তাঁর কাছে গিয়েছি। পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বাংলা একাডেমিতে সংস্কৃতি সংসদের অনুষ্ঠান করব, মহাপরিচালকের অনুমোদন প্রয়োজন। শর্ত পেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে পরিচিতপত্র আনতে হবে। অনেকেই দিতে রাজি হলেন না। বিনা প্রশ্নে সেই দায়িত্ব পালন করলেন গিয়াসুদ্দীন স্যার। একদিন তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে উল্টো দিক থেকে নামতে থাকা স্যারের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম। সস্নেহে হাত ধরে তুলে দরাজ গলায় স্বভাবসুলভ হা হা করে হেসে বললেন, ‘ভাবলাম, মাইরাই ফালাইলাম বুঝি!’

গুরু-শিষ্যের এই শ্রদ্ধাপূর্ণ আন্তরিকতা একেবারেই কি হারিয়ে গেছে এই মানুষগুলোর হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে? এই মানুষগুলোকে পড়ে থাকতে হলো মিরপুরের বধ্যভূমিতে নির্মম, নিষ্ঠুর, ক্রূর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে? চিরকালের জন্য ‘গুম’ হয়ে যেতে হল স্বজনদের অসহ্য প্রতীক্ষার কষ্টের মধ্যে ফেলে?

শহীদুল্লা ভাই, গিয়াসুদ্দীন স্যার দুজনেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার মায়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। লুঙ্গি পরে, মাথায় ঝাঁকা নিয়ে গিয়াসুদ্দীন স্যার মুটে সেজে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রসদ, টাকা, কাপড়চোপড় বহন করে নিয়ে গেছেন মায়ের কাছ থেকে। শহীদুল্লা ভাই প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের, মুক্তিযোদ্ধাদের নানা খবরাখবর আদান-প্রদান করেছেন আমাদের বাড়ি থেকে—জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে। নিরাপত্তার জন্য মায়ের ওপর রেখেছেন কড়া নজর। মায়ের বড় কষ্ট ছিল তাঁর পুত্রসম শহীদুল্লাকে রক্ষা করতে পারেননি বলে। বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কী ভয়ানক পথ তারা বেছে নিয়েছিল।

দুঃখের সীমা থাকে না আজ, যখন এই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে একইভাবে দুর্বৃত্তের হাতে গুম হচ্ছে মানুষ, খুন হচ্ছে মুক্তবুদ্ধির মানুষ। সেই একাত্তরের পরাজিত শত্রুরাই নতুন রূপে, নতুন সুযোগে আজও ধারাবাহিকভাবে হত্যা করে চলেছে, হত্যার হুমকি দিয়ে চলেছে সেই মানুষদের, যাঁরা কথা বলার স্বাধীনতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র আর মানুষের মুক্তির সপক্ষে দাঁড়ান।

১৪ ডিসেম্বরের শোক আমাদের এই প্রতিজ্ঞা নিতে অনুপ্রাণিত করুক, এসব দুর্বৃত্তকে আমরা রুখবই।

সুলতানা কামাল: মানবাধিকারকর্মী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
কর্টেসীঃ প্রথম আলো অনলাইন।

আপনার মন্তব্য

Check Also

আজ দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা

ঢাকা: আগামী ১৫ মে হতে যাওয়া গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের …